ফয়েজ আহমদ হাজার ছড়ার পাণ্ডুলিপি

জাকির হোসেন
প্রবীণ সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ছড়াকার ফয়েজ আহ্মদ এখন শত শত ছড়ার পাণ্ডুলিপির ওপর বসে আছেন। প্রকাশকরা তাঁর ছড়া ছাপাতে আগ্রহী, কিন্তু খরচের কারণে প্রকাশ করতে ততটা আগ্রহী নন। নিজের জীবনের সঙ্গে ছড়াকে ফয়েজ আহ্মদ সারা জীবন সম্পৃক্ত করেছেন। ৮১ বছর বয়সেও ছড়া সাহিত্য থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারছেন না। আপন সন্তানের মতোই ছড়াকে লালন করেন তিনি। প্রায় প্রত্যহই তিনি ছড়া সম্পর্কিত আলোচনায় ব্যাপৃত হন অথবা কিছু না কিছু লেখেন। তাঁর প্রকাশিত শ’খানেক বইয়ের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটি ছড়ার বই এবং এ যাবত্ চারটি ছড়ার সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতি বছর তিনি যে সংখ্যক ছড়া লেখেন, তার অর্ধেকও ছাপা হয় না। ফলে প্রতি বছর কিছু না কিছু ছড়া অবহেলিত থেকে যায়। সেগুলো সঞ্চিত হয়ে এখন এক হাজার ছড়ার পাণ্ডুলিপিতে পরিণত হয়েছে। অপ্রকাশিত এই ছড়াগুলো অত্যাধুনিক এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি ছড়া দিয়েই লেখালেখির জীবন শুরু করেছিলেন স্কুলে থাকতে। ১৯৪৪ সালে ক্লাস এইটে থাকতে তিনি বিক্রমপুরের বাশাইলভোগ গ্রাম থেকে একটি ছড়া শিশু সওগত-এ প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। প্রকাশিত হবে এমন দৃঢ়বিশ্বাস তাঁর ছিল না। কিন্তু তাঁকে আশ্চর্য করে শিশু সওগাতে ‘নাম বিভ্রাট’ নামের ওই ছড়াটি প্রকাশিত হয়। যখন তিনি পত্রিকাটি ডাক মারফত হাতে পান, তখন তিনি আনন্দে-উল্লাসে এই জগত্টাকে যেন অতিক্রম করে যান। এই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম প্রকাশিত ছড়া। সেই ফয়েজ আহ্মদ ৮১ বছর বয়সকাল অতিক্রম করতে চলেছেন। সারা জীবন সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার পাশে তিনি দেশে শ্রেষ্ঠ ছড়াকার হিসেবেও দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন দেশের কবিদের কবিতার বাংলা অনুবাদ তিনি করেছেন। হো চি মিনের ‘জেলের কবিতা’র বাংলা অনুবাদ তিনি করেছেন। বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের অধিকারী ফয়েজ আহ্মদ সম্প্রতি আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, সক্রিয় রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন বিষয়ে বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিষয়ে নৈরাশ্য ব্যক্ত করেন।

আলাপের শুরুতেই তিনি বলেন, তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ক্ষমতা আমার শারীরিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আমার চোখের গ্লুকোমা দু’বার অপারেশন হয়েছে। ’৭৯ সালে আমি দ্রুত হার্ট অপারেশন করতে বাধ্য হই ব্যাঙ্গালোরে। বাম পায়ের হাঁটুতে আমার চিরস্থায়ী রোগ বাসা বেঁধেছে। এখন আমাকে লেখার জন্য একজনের অবলম্বন হয়তো একান্ত প্রয়োজনে নিতে হয়। নিজের হাতে লেখার যে গৌরব ও আনন্দ আছে, তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলে আমার ধারণা। অনুলিখনের জন্য আমাকে লেখক/লেখিকার সাহায্য নিতে হয়। স্মৃতির অধিকাংশ সময় যেন হঠাত্ করে হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে হঠাত্ অতীতের অনেক ঘটনা মনে জাগরিত হয়ে ওঠে। তখন পারলে নোট রাখি, নইলে অনুলেখকের জন্য বক্তব্যটা রেখে দেই। তাছাড়া আরও একটি রোগ আমাকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে। সব সময় এখন আর বেশিক্ষণ বসার ক্ষমতা রাখি না। এমন অবস্থার মধ্যে আমি ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের একজন বয়স্ক চিকিত্সাধীন রোগী। এখন কোনো অনুষ্ঠানে যাই না তা নয়—তবে অল্পক্ষণ বসতে হয়। আর অভ্যাসের বশে ছড়া লিখি। বিভিন্ন নিবন্ধ ও প্রবন্ধও এখন মাঝে মাঝে লিখছি। তবে তা একান্তই অনুরোধের ফলাফল।

সহস্রাধিক ছড়া কীভাবে অপ্রকাশিত রয়ে গেল, জানাতে চাইলে তিনি বলেন, এক সময় ছিল যখন ৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশকে আমার লেখা প্রতিটি ছড়াই ছাপা হয়ে যেত বিভিন্ন কাগজে। পরবর্তী সময়ে যা ছাপা হয়, তার চেয়ে বেশি আমি লিখতে থাকি। ফলে প্রকাশকরা যে ছড়া প্রকাশের জন্য নেন, তার থেকে অধিকতর ছড়া আমার কাছে জমা হয়। এভাবেই আমার ঘরে সহস্রাধিক ছড়ার পাণ্ডুলিপি সঞ্চিত হতে থাকে। সেই ছড়াগুলো আমি এখন প্রকাশের জন্য উন্মুখ। কোন লেখক তাঁর লেখা অপ্রকাশিত রাখতে চায়? আমি সেই ধরনের একজন ছড়াকার-লেখক।

দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত শিশুদের পাতা বিষয়ে ফয়েজ আহ্মদ বলেন, দৈনিক পত্রিকায় শিশুদের বিভাগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবহেলিত। এই পৃষ্ঠার প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয় না। কোনো একজন বন্ধুর ছেলে অথবা একজন অল্পবয়সী অপরিপকস্ফ যুবককে এই ক্ষেত্রে নিয়োগ করা হয়। এ কারণে এই পৃষ্ঠার মান রক্ষিত হয় না। বড়দের সাহিত্য পাতার প্রতি যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়, ছোটদের জন্যও তেমনি গুরুত্বারোপ করতে হবে। অপরিপকস্ফ ও অবাঞ্ছিত বহু লেখায় ছোটদের পাতাগুলো ভরার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। বিখ্যাত কাগজগুলোও একইরকমভাবে অবহেলার পথ অবলম্বন করে।

এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কী করা উচিত—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিশুদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক চেতনায় সমৃদ্ধ করতে চাইলে শিশুদের পৃষ্ঠাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও উজ্জ্বল করার প্রয়াস নিতে হবে। শিশুদের যেন জ্ঞান বাড়ে, বিশ্বকে তারা যেন নতুন দৃষ্টিতে দেখে এবং কল্পনাশক্তি বাড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যে কোনো প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প বা ছড়া তাদের সামনে দেয়া যাবে না। শিশুদের ছড়ার পৃথিবী আরও বিস্তৃত হতে হবে—জনগণের কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।

ছড়া রচনার সূচনা এবং ছড়ার বই প্রকাশ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার প্রথম পুস্তক (ছড়ার বই) ১৯৫৪ সালে প্রথম লিখিত হয়। এই বই প্রকাশের ব্যাপারে তখন ঢাকায় উন্নতমানের প্রকাশক ছিল না বলে প্রকাশে বিলম্ব হতে থাকে এবং বড় সমস্যা দেখা দেয় ছড়াগুলোর ছবি আঁকার শিল্পীর অভাব। শেষ পর্যন্ত কামরুল হাসানকে দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বছরেও বইটির ছবি আঁকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আমি আমার বন্ধু শিল্পী বিজন চৌধুরীকে দেই ছবি আঁকার জন্য। তিনি দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর একদিন গোপনে কলকাতা চলে যান এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। এ কারণে আমি বিজন চৌধুরীর সন্ধানে কলকাতা যাই (১৯৫৬ সালে)। কলকাতার কালিগঞ্জে শিল্পী বিজন চৌধুরীর সন্ধান লাভ করি। সেখানে শেষ পর্যন্ত বিজন চৌধুরী তিন দিনে বইটির ছবি আঁকেন। তিনিই আমরা প্রথম বই ‘জোনাকী’র ছবি আঁকেন। বিজন চৌধুরী এখনও কলকাতায় জীবিত। এই জোনাকী বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন প্রয়াত কামরুল হাসান।

সেই ’৫৬ সাল থেকে আমার ছড়ার বই প্রথম প্রকাশ শুরু হয়। সেকালের ‘আর্ট অ্যান্ড লেটারস্’ প্রকাশনী এই পুস্তকটি প্রকাশ করে। এই জোনাকী অঙ্কুরিত হয় ১৯৪৪ সালে। ১৯৫৬ সালে প্রায় ১২ বছর পর প্রধানত শিল্পীর অভাবে তাঁর প্রথম বই প্রকাশ পায়। কারণ গোড়ার দিকে বাংলাদেশে শিশু সাহিত্য অঙ্গনে কোনো উপযুক্ত শিল্পী ছিলেন না।

তিনি বলেন, আমি যে ছড়াই কেবল লিখেছিলাম তা নয়—স্কুলের শেষের দিকে আমি ব্যাপকভাবে পাঠ করেছি এবং সেই সময় আমার হাতে আসে রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ ‘মানসী’। আমি আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের ও শরত্ বাবুর কিছু বই পেয়েছিলাম। সে সময় অনেক পুস্তক পাঠ করেছি, কিন্তু তার মর্ম উপলব্ধি করতে পারিনি। আমি স্কুলের শেষের দিকে ৪০ দশকের মাঝামঝি সময়ে স্থানীয় প্রয়াত প্রখ্যাত ডাক্তার নন্দীর সঙ্গে সম্পর্কিত হই। তিনি আমাকে প্রতি মাসে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ ও ‘পরিচয়’ পত্রিকা পড়তে দিতেন। এসব পত্রিকার লেখা আমি তখন বুঝতে পারতাম না। তাছাড়া আমাদের বাড়িতে আসত মাসিক ‘সওগত’। এসব পত্রিকা ও বইয়ের মাধ্যমেই আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

প্রথম ছড়া প্রকাশের অনুভূতি সম্পর্কে তিনি বলেন, শিশু সওগতে আমার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হওয়ার পর আমি আনন্দে পাগলের মতো হয়ে যাই। আমি আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে আমার প্রকাশিত ছড়া দেখাই। এমনকি বিক্রমপুরের শ্রীনগরের বাজারে বিভিন্ন দোকানিকে পর্যন্ত দেখিয়েছি। প্রথম ছড়া প্রকাশের পর এক পর্যায়ে আমি স্কুল থেকে বাড়ি না ফিরে বিক্রমপুর থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ ঘাট এবং সেখান থেকে রেলে চেপে কলকাতায় শিশু সওগাত অফিসে যাই। তাঁরা আমাকে দেখে তো অবাক। তাঁরা বিশ্বাসই করতে চায়নি আমার ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। এক পর্যায়ে একজন বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি চলে যাও। কারণ তোমার ছড়া প্রকাশিত হয়েছে সম্পাদক জানলে আমাদের চাকরি থাকবে না। কারণ ছড়া লিখবে বড়রা, কিন্তু পড়বে ছোটরা।

আপনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন। কিন্তু ছড়াকে প্রধান উপজীব্য করলেন কেন—জানতে চাইলে ফয়েজ আহমদ বলেন, প্রকৃতপক্ষে প্রথম জীবনে কবিতা লেখার দিকে প্রধানত ঝোঁক ছিল। কিন্তু স্কুল জীবনে লেখা কবিতা মানসম্পন্ন ছিল বলে মনে করি না। স্কুল জীবনে আমার লেখা একটি ছড়া কলকাতা থেকে প্রকাশিত শিশু সওগাতে প্রকাশিত হওয়ার পর ছড়া লেখার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠলো। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ছিলেন আমাদের প্রধান কবি ও সাহিত্যিক। আমার ভ্রান্ত ধারণা ছিল, এই দুজন মহান লোকের পর আর কারও সাহিত্য লেখার প্রয়োজন নেই।

আমি লক্ষ্য করছিলাম, বাংলা শিশু সাহিত্য অনেক দুর্বল। মানুষের স্বভাবগত কারণে অনেক সময় রচনার গতি-প্রকৃতি নানা ধারায় প্রবাহিত হয়। আমার কেবল ছড়া লেখার প্রবণতা সে কারণে আরও বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তান হওয়ার পরপরই ঢাকার পত্রিকাগুলোর ছড়ার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। তাছাড়া আমার জীবনধারা জেল, আন্ডারগ্রাউন্ড, দেশ থেকে পলায়ন—সবকিছুই ব্যতিক্রমী ছিল। সুস্থিরভাবে কখনও সাহিত্য রচনার প্রতি সুবিচার করতে পারিনি।

নিজের রচিত ছড়ার বৈশিষ্ট্য বিষয়ে তিনি বলেন, ছড়াকে আমি পরিপূর্ণ সাহিত্য হিসেবেই গ্রহণ করেছি। আমি জানতাম, ছড়ার অপরিপকস্ফতা, অস্পষ্টতা দূর করা ও মূল্যায়ন করা খুব প্রয়োজন। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের গোড়াপত্তনেই ছড়ার আধিপত্য রয়ে গেছে। ভাষা তখন ছিল অপরিচ্ছন্ন, শব্দ তখন সুগঠিত নয় এবং প্রকাশভঙ্গি ছিল চলমান ধারায়। ফলে ছড়ার মধ্যে আমরা বিশেষ বিশেষ যুগের ও সময়ের প্রতিফলন দেখতে পাই। সে কারণেই ছড়া আমাদের অতীত জীবনধারা, রাজ্যশাসন, খাদ্যপ্রণালী, সামাজিক পদ্ধতি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তত্কালীন সভ্যতার বিকাশের চিত্র ছড়ায় প্রতিফলিত হয়ে আছে। সেজন্য ছড়া আমাদের ঐতিহ্য এবং জীবনের ধারাকে রক্ষা করেছে।

সেই ছড়া এখন আর লেখা যাবে না। আমরা আধুনিক কালের মানুষ—নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও পরিবর্তিত ব্যবস্থার মধ্যে আমরা এক নতুন ধরনের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্ধিত হচ্ছি। এই পরিবর্তিত অবস্থা নিয়েই প্রাচীন ছড়া রচিত হয়। তার ফলে বর্তমান কালের ছড়ায় আধুনিক জীবনযাত্রা ও শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বক্তব্য প্রতিফলিত হয়ে থাকে। কাঠামোগত দিক হয়তো অনেকটা রক্ষা করা যায়; কিন্তু বিষয়বস্তু সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য একেবারেই আধুনিক হতে বাধ্য। সে কারণে ছড়া বাংলা সাহিত্যের মধ্যে আপন উপকাঠামোর মধ্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চরিত্র নিয়ে বর্তমানে আত্মপ্রকাশ করছে।

আধুনিক ছড়া বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন বিষয়ে মন্তব্যে তিনি বলেন, চরিত্রগত দিক থেকে ছড়া এখন যে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তাকে পরিপূর্ণ সাহিত্যের মর্যাদা দেয়া যাবে। এর কাঠামোগত দিকটা ছড়ার বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখতে চেষ্টা করছে। বাংলা সাহিত্যের বহু বিখ্যাত লেখকই শিশুদের জন্য ছড়া লিখেছেন—রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পর্যন্ত। তাঁরাও জীবনের এক স্তরে ছড়া লিখতে গিয়ে আধুনিক ছড়ার বৈশিষ্ট্যকেই প্রকাশ করেছেন। সুকুমার রায় থেকে আরম্ভ করে অনেক শিশু সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করা যায় যাঁরা ছড়াকে পরিবর্তিত, সুসজ্জিত ও অলঙ্কৃত করেছেন। এখন আমাদের সাহিত্যে ছড়াকে উপেক্ষা করা যায় না। ছড়াকে উপেক্ষা করে আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা কখনও সম্ভব হবে কিনা জানি না। ছড়ার প্রকাশভঙ্গির দিকটা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একথা ঠিক যে ছড়া আমার জীবনে প্রধান্য বিস্তার করেছে। সে কারণে ছড়ার বৈশিষ্ট্য আমাকে আচ্ছন্ন করে আছে। বার্ধক্য যদি আমাকে (এখন বয়স ৮১ বছর) আচ্ছন্ন করে না রাখত, তবে হয়তো আমি আজকে অন্য কোনো প্রভাবে আকৃষ্ট হতাম।

তিনি বলেন, ৫০ ও ৬০-এর দশকে আমি আঙুরের মতো থোকা থোকা ছড়া দেখতে পেতাম। কোথাও হেঁটে যাওয়ার সময় আমি ছড়া লিখেছি, নৌকায় আমি ছড়া লিখেছি এবং রিকশায় আমি ছড়া লিখেছি। ছড়া রচনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় আমি জীবনে কখনও রাখিনি। দিনে বা রাতে কাজের মধ্যে ছড়া লেখার সময় আমি বের করে নিয়েছি।

সংক্ষিপ্ত জীবন-বৃত্তান্ত
বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের অধিকারী ফয়েজ আহ্মদ আমাদের দেশের একজন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, সক্রিয় রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত। তিনি ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বাসাইলভোগ গ্রামে এক সামন্ত পরিবারে ১৯২৯ সালের ২ মে জন্মগ্রহণ করেন। ৩৫ বছর সাংবাদিকতা করার সময় থেকে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠন পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম সম্পাদক ছিলেন। এ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। তিনি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এই পদে প্রায় তের বছর থাকার পর তিনি পদত্যাগ করেন। সে সময় তিনি আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ থেকে অবসর নেন।

ফয়েজ আহ্মদ ১৯৪৮ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। তিনি দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদ ও পরবর্তীকালে পূর্বদেশে চিফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক ইনসাফ ও ইনসান পত্রিকায় রিপোর্টিং করেছেন। ১৯৫০ সালে হুল্লোড় পত্রিকার সম্পাদক, ১৯৭১ সালে স্বরাজ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বিএসএস) প্রথম প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে তিনি দৈনিক বঙ্গবার্তার প্রধান সম্পাদকরূপে কাজ করেন। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় ঢাকাস্থ অফিসের প্রধান সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর সিন্ডিকেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ৮০ ও ৯০-এর দশকে। তিনি ৮০ দশকে জাতীয় কবিতা উত্সবের প্রথম পাঁচ বছর আহ্বায়ক ছিলেন। তাছাড়া ১৯৮২ সালের দিকে বাংলা একাডেমীর কাউন্সিল সদস্য (গোপন ব্যালটে) নির্বাচিত হন। কিন্তু সামরিক শাসনের প্রতিবাদে তিনি অন্য ৬ জনের সঙ্গে পদত্যাগ করেন। ফয়েজ আহমদ জাতীয় প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্য।

তিনি সারা জীবনই প্রধানত শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। বর্তমানে তাঁর বইয়ের সংখ্যা প্রায় একশ’। এর মধ্যে ৫০টি শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতার পুস্তক। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী তাঁর চারটি শিশু পুস্তক ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তাঁর লেখা ছড়া নিয়ে একটি আবৃত্তি ও একটি সঙ্গীতের ক্যাসেট বেরিয়েছে। তাঁর বইগুলোর মধ্যে মধ্যরাতের অশ্বারোহী, ট্রিলজী সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ পুস্তক বলে বিবেচিত। ছড়ার বইয়ের মধ্যে ‘হে কিশোর’, ‘কামরুল হাসানের চিত্রশালায়’, ‘গুচ্ছছড়া’, ‘রিমঝিম’, ‘বোঁ বোঁ কাট্টা’ ‘পুতিল’, ‘জোনাকী’, ‘ছড়ায় ছড়ায় ২০০’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চীনসহ বিভিন্ন দেশের কবিতার ৫টি বই তিনি অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে হো চি মিনের জেলের কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দশটি দেশের অনুবাদ কবিতার বইয়ের নাম ‘দেশান্তরের কবিতা’।

ফয়েজ আহ্মদ এ পর্যন্ত বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, সাব্বির সাহিত্য পুরস্কার, দুবার ব্যাংক পুরস্কার ও ১৯৯১ সালে সাংবাদিকতার জন্য একুশে পদক লাভ করেন। তাঁকে নুরুল কাদের সাহিত্য ও মোদাব্বের হোসেন আরা শিশু সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, ঋষিজ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ গণপরিষদ ও জাতীয় প্রেসক্লাব তাঁকে গুণীজন হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে।

[ad#co-1]

এমন আরও কিছু খবর:

  1. শফিউদ্দিন আহমদ বিক্রমপুরের চারণ সাংবাদিক
  2. বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে :ড. সালেহউদ্দিন আহমদ
  3. শিশুটির মূল্য ৩০ হাজার টাকা!
  4. ড. ফখরুদ্দীন আহমদ এখন নিউইয়র্কে
  5. ড. ফখরুদ্দীন আহমদ আজ যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>